পুজোয় প্রত্যক্ষ রাজনীতি এবং ‘দেবীর অপমানে’ ক্ষোভ বাড়ছে জনমানসে



“ক্লাব বলা সত্বেও আমি ওই দেবীর পায়ে হাওয়াই চটি দিইনি।“– প্রতিমা শিল্পী মিন্টু পাল।
মন্ডপে চটির ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় শিল্পী মিন্টু পাল বলেন, “ওটা না করলেই ভালো হত।”

অশোক সেনগুপ্ত
কখনও মন্ডপে চটি, কখনও মায়ের মুখ বোরখায় ঢাকা। কখনও নেত্রীর মুখের আদলে প্রতিমার মুখ। কখনও পুজোয় প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক দলের প্রচার। এবারের দুর্গাপুজোয় তৈরি হয়েছে একটা অস্বস্তির পরিস্থিতি। বিষয়টা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

পরিচালক আলি আব্বাস জাফর সম্প্রতি অ্যামাজন প্রাইমের জন্য ‘তান্ডব’ নামে একটি ওয়েব সিরিজটি বানান।  সেখানে হিন্দু দেবদেবীদের পোশাকে অভিনেতারা কদর্য ভাষায় কথাবার্তা বলেছেন – এই অভিযোগে চলতি বছরের গোড়ার দিকে লখনউয়ের হজরতগঞ্জ থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মিডিয়া উপদেষ্টা শলভ মণি ত্রিপাঠী সেই এফআইআরের একটি প্রতিলিপি টুইট করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান।

প্রায় একই সময় বিতর্ক ওঠে সায়নী ঘোষের পুরনো একটি টুইট নিয়েও। সেখানে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে শিবলিঙ্গকে কন্ডোম পরানোর ছবি পোস্ট করা হয়েছিল। সায়নীর দাবি, ওই ছবি থেকে স্পষ্ট এইডসের বিরুদ্ধে সচেতনতা অভিযানের অংশ হিসেবেই সেটি পোস্ট করা হয়েছিল। কিন্তু অনেকে আবার দেবদেবীদের নিয়ে এই ধরনের ‘চটুলতা ও অশ্লীলতা’ মেনে নিতে পারেননি। বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা তথাগত রায় রবীন্দ্র সরোবর থানায়  একটি এফআইআরে এ ব্যাপারে অভিযোগ আনেন। বলেন, ওই টুইট একজন ‘একনিষ্ঠ শিবভক্ত’ হিসেবে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসে চরম আঘাত হেনেছে। পঁচিশ বছর আগে তিনি পায়ে হেঁটে কৈলাস-মানস সরোবর পাড়ি দিয়ে শিবের পূজা দিতে গিয়েছিলেন।  ভারতীয় দন্ডবিধির ২৯৫এ ধারায় ওই অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। মান্যতা পায়নি সেই অভিযোগ।

সাম্প্রতিক অতীতে এ রকম বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে যাতে অপমানিত হয়েছেন হিন্দুদের একটা বড় অংশ। ‘মীর’-এর ভাঁড়ামিতে তোপ দেগেছেন নেটানাগরিকরা। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, “আপনাদের ধর্ম নিয়ে তো এরকম ভাঁড়ামি করতে কখনও দেখিনি?”

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখের আদলে কলকাতার একটি বড় পুজোয় প্রতিমার মুখ তৈরি করে এবার বিতর্ক তৈরি করেছেন কুমোরটুলির নামী শিল্পী মিন্টু পাল। পুজোর সঙ্গে রাজনীতির মিশেলকে আপনি সমর্থন করেন? উত্তরে মিন্টুবাবু এই প্রতিবেদককে বলেন, “না। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সেটা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।“ তাহলে বিতর্ক উঠছে জেনেও কেন নেত্রীর মুখের আদলে দেবীমুখ করলেন? মিন্টুবাবুর জবাব, “উদ্যোক্তারা রাজ্যের উন্নয়ন দেখাতে চেয়েছিলেন বলে।“ তার জন্য কেন মুখ্যমন্ত্রীর মুখের আদলে দেবীমুখ করতে হবে? উত্তর, “বরাবরই এভাবে উদ্যোক্তা নেতারা ধর্মের হাত ধরে প্রচারের আলোয় আসতে চেয়েছেন।“

ইন্দিরা গান্ধীর মুখ বসিয়ে দেবী দুর্গা তৈরির চেষ্টা তো আগে দেখিনি! সোমেন মিত্র, অজিত পাঁজারা বড় পুজো করতেন। তখন তো এরকম বিতর্ক ওঠেনি! আপনি তো নেতাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে শিল্পীর দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন? উত্তর, “এই বাংলার শিল্পীই কিন্তু ইন্দিরাকে বিশ্বজননী বলে গান গেয়েছেন।“ কিন্তু গান আর ধর্ম তো এক নয়! মিন্টুবাবুর উত্তর, “না, ঠিকই। তবে, ক্লাব বলা সত্বেও আমি ওই দেবীর পায়ে হাওয়াই চটি দিইনি।“

জাতীয়তাবাদী অধ্যাপক ও গবেষক ডঃ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানান, “স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উত্থান বামপন্থী আদর্শের উপর ভিত্তি করে, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে শিল্পচর্চায় শিল্পীদের স্বাধীনতা নিয়ে বাগাড়ম্বর তাঁদেরই বেশি। বস্তুত আদি রামায়ণে অকাল বোধনের উল্লেখ না থাকলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণে ওটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যুগে জমিদারি ব্যাবস্থায় জমিদারের যশ ও ঐশ্বর্যের সঙ্গে দূর্গাপূজা জুড়ে যায়। স্বর্গীয় অমলেশ ত্রিপাঠী এর মানসিক দিকটি অসাধারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন।

বিজেপি-র রাজ্য কমিটিরসদস্য তথা চলচ্চিত্র পরিচালিকা সঙ্ঘমিত্রা চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, “বাংলার বাঙালি নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলতে ভালবাসে, ভাবতে ভালবাসে। এতে তাঁদের আঁতেলপনা বাড়ে। আর ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সংখ্যালঘু তোষণ ও হিন্দুত্বকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার প্রবণতাও বাড়ছে। এটা যেমন ৩৪ বছরের বাম রাজত্বের প্রভাব, তেমনই ১১ বছরের তৃণমূলের সংখ্যালঘু তোষণও একটা বড় কারন।

দুর্গা পুজোকে যেদিন থেকে শারদোৎসব আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তবে থেকে শুরু হয়েছে বাঙালী হিন্দুদের এই ধ্যষ্টামো। পুজোকে পুজোর মত করে দেখতে হবে। থিম পুজোর নাটক বন্ধ করে নিষ্ঠা ভক্তির উপর পুরস্কার ঘোষণা করলেই এই নোংরামো বন্ধ হবে।“

শনিবারই দমদম পার্ক জাগৃতি সঙ্ঘের মন্ডপে জুতো প্রসঙ্গে টুইট করেন শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে তিনি লেখেন, শিল্পের স্বাধীনতা নামে মা দুর্গাকে অপমান করা হয়েছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। তা সরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী এবং স্বরষ্ট্রসচিব বি পি গোপালিকার কাছে আবেদন করেন, যাতে তাঁরা ওই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। আয়োজকদেরও বলেন, ওই জুতো সরিয়ে নেওয়ার জন্য।

মন্ডপে চটির ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় শিল্পী মিন্টু পাল বলেন, “ওটা না করলেই ভালো হত। আমরা সকলেই তো ধর্মস্থানে জুতো খুলে ঢুকি। কৃষক আন্দোলন ঠিক না বেঠিক, সেটা নিয়ে রাজনীতি চলতে পারে। পুজোর সঙ্গে সেটার মিশেল কেন? শুধু শিল্পকর্মের দোহাই তুললে তো হবে না। মানুষের ভাবাবেগকেও সম্মান দিতে হবে।“ যদিও নেত্রীর মুখের আদলে দেবীমুখ তৈরির সময় তাঁর এই চেতনা আদৌ ছিল কিনা, প্রশ্ন ওঠে তা নিয়ে।

প্যান্ডেলে জুতোর ব্যাপারে ফিরহাদ হাকিম জোকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘জগদ্ধাত্রী মা আমাদের সবাইকে তৈরি করেছেন। আমি তার মণ্ডপ কী দিয়ে সাজাবো তা বিজেপি ঠিক করে দেবে না কি? আজকের পরিস্থিতি ফুটিয়ে তুলতে এই মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। তাতে জুতোকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিজেপির গায়ে লেগেছে কারণ ওদের মনে পাপ আছে।’

তথাগত রায়ের বক্তব্য, “থিমের নামে মণ্ডপে জুতোর ব্যবহার কদর্য হিন্দু বিরোধী পদক্ষেপ। শিল্পীর স্বাধীনতার মানে যা খুশি তাই নয়। দেশ ও রাজ্যকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতেই হবে। মণ্ডপে আজান সম্প্রীতির বার্তা, ঠিক যেমন মসজিদে পুজোর সময় মহিষাসুরমর্দিনী চালানো উচিত।”

পুজোর মুখে হিজাব-পড়া দেবীমূর্তির মুখ এঁকে প্রবল সমালোচিত হন সনাতন দিন্দা। সামাজিক মাধ্যম থেকে তিনি সেই ছবি সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও ২৯ সেপ্টেম্বর একটি বাংলা দৈনিকে নিজের কাজের সমর্থনে বলেন, “কার ভাবাবেগ ধাক্কা খাবে তা মাথায় রেখে আঁকব!” সেই খবরে ফেসবুকে ফের নিন্দিত হন সনাতন দিন্দা। সনাতন অবশ্য স্বীকার করেছেন, “আমরা উৎসবে মেতে রয়েছি! এখানে দেওয়া-নেওয়ার রাজনীতি চলছে, পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি চলছে। গণেশ পুজো, দুর্গাপুজো সবই হচ্ছে।“

এবার পুজোর মুখে মির্চি বাংলায় মীর ‘মা দুর্গা আসছেন মর্তে, তার আগে কী বললেন শিব?’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান করেন। রবিবার সন্ধ্যা সওয়া ছ’টা পর্যন্ত ৮ লক্ষ ৩২ হাজার দেখেছেন। ৪২ হাজার জন লাইক দিয়েছেন। মন্তব্য ও শেয়ারের সংখ্যা যথাক্রমে ২ হাজার ও ৭ হাজার ৯০০। সমালোচনার ঝড়ের মুখে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে ফেসবুকে মীর লিখেছেন, “যাই হোক… বড় একটা শিক্ষা হল আমার। অশেষ ধন্যবাদ তাঁদের যাঁরা বার বার মনে করিয়ে দেন আমি শুধুই একজন মুসলমান, আর অন্য কোনো পরিচয় নেই মীরের।“

ডঃ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “একথা অনস্বীকার্য যে, পূজা ও শক্তির আরাধনা অপেক্ষা উৎসব ও মোচ্ছবই এখন মুখ্য। মৃন্ময়ী মায়ের প্রাণ সঞ্চারকারী সেই পুরোহিতের কান্না গত বছরেই সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। এখনও মা দুর্গা সকলের কাছে আপন হতে পারলো না। অমুকের পূজা, তমুকের বনেদি বাড়ির পূজা হয়েই রয়ে গেল। এখন তো দুর্গাপুজোর রাজনীতিকরব ঘটে গেছে। ওদের বহিরাগত রাম বনাম আমাদের ঘরের দুর্গা। একসাথে দুই-এক বছর সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর পরব পড়াতে রাজনৈতিক তরজা ও মোকদ্দমা কম হয়নি। প্রশাসনের অনুমতি ও অনুদান— দুটো বিষয়ই হিন্দু সমাজের কাছে লজ্জাজনক। এর সঙ্গে ’শিল্পীর স্বাধীনতা’ রক্ষায় জুতো, হিজাব, আজান, নেত্রীর মুখ— মার খাওয়া উদ্বাস্তু হিন্দু সমাজের কাছে গা সওয়া হয়ে গেছে।

আসলে বাংলাদেশের অত বড় বাজার ধরার জন্য হিন্দু সমাজ ও বিশ্বাসের নিন্দামন্দ করাটা শিল্পীর কাছে জরুরি। অভিজাত ভিক্ষাবৃত্তিকে আর কী বলা যায়? তবে সমাজ মাধ্যমের বর্তমান দিকনির্দেশনা বলছে যে, “কোথাও যেন সেই অশুভ শক্তির বিনাশ ধ্বনির অস্ফুট স্বর শোনা যাচ্ছে।”